সহিংসতা কেন অবৈধ নয় : হাইকোর্ট
হরতাল-অবরোধের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে সহিংসতা, নাশকতা ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষা নির্বিঘ্ন করতেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সরকারকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পরীক্ষায় বিঘ্ন সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ারও নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
পৃথক দুটি রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে রোববার বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই অন্তর্বর্তী আদেশসহ একাধিক রুল জারি করেন।
২০ দলীয় জোটের চলমান অবরোধ-হরতালে নাশকতার চিত্র তুলে ধরে হরতাল-অবরোধে সন্ত্রাস, নাশকতা বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে কেরানীগঞ্জের ব্যবসায়ী শাহীনুর রহমান শাহীন একটি রিট আবেদন করেন। এ ছাড়া হরতাল-অবরোধের মধ্যেও এসএসসি পরীক্ষা নির্বিঘ্ন করার দাবিতে কেরানীগঞ্জের ইস্পাহানি স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির পক্ষে শফিউল আজম খান বারকু অপর রিটটি করেন।
প্রথম রিটে স্বরাষ্ট্র সচিব, আইন সচিব, পররাষ্ট্র সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, র্যাবের মহাপরিচালক, বিজিবির মহাপরিচালক, ডিএমপি কমিশনার, ২০ দলীয় জোটের প্রধান খালেদা জিয়াসহ ১৬২ জনকে বিবাদী করা হয়েছে। অপর রিটেও এসব বিবাদীসহ ১৬০ জনকে বিবাদী করা হয়েছে। বিবাদীদের মধ্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মির্জা আব্বাস, সাদেক হোসেন খোকা, রিজভী আহমেদ, সালাউদ্দিন আহমেদ, রিয়াজ রহমান, সাবিহ উদ্দিন আহমেদ, বিকল্প ধারার সভাপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, কল্যাণ পার্টির সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মোহাম্মদ ইবরাহিম, এলডিপি সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমেদসহ ১৯ নেতার নাম রয়েছে।
রোববার রিট দুটির পক্ষে শুনানি করেন সাবেক আইনমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক আবদুল মতিন খসরু, ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, অ্যাডভোকেট আবদুল বাসেত মজুমদার, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, নুরুল ইসলাম সুজন এমপি, সানজিদা খাতুন প্রমুখ।
আদালত রুলে হরতাল-অবরোধের নামে মানুষ হত্যা, জ্বালাও-পোড়াও, মানুষের জানমালের নিরাপত্তা ধ্বংস এবং সহিংসতাকে কেন অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়েছেন। হরতাল-অবরোধের নামে হুমকি, সহিংসতা এবং ৫ জানুয়ারির অবরোধ ডাকা এবং তা অব্যাহত রাখাকে কেন অবৈধ ও বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, রুলে তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত এসএসসি পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত সময়কালে হরতাল-অবরোধ আহ্বান করাকে কেন অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়েছেন হাইকোর্ট। ৫ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত হরতাল-অবরোধে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দিতে ২০ দলীয় জোটনেত্রী খালেদা জিয়াসহ হরতাল আহ্বানকারীদের কেন নির্দেশ দেয়া হবে না, তাও জানতে চাওয়া হয়েছে। চার সপ্তাহের মধ্যে বিবাদীদের এসব রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
নির্দলীয় সরকারের অধীনে আগাম নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ৫ জানুয়ারি থেকে টানা অবরোধ চালিয়ে আসছে। এরই মধ্যে ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে সাপ্তাহিক ছুটি বাদে প্রতিদিনই চলছে হরতাল। অবরোধ ও হরতালের মধ্যে নাশকতা, সহিংসতা ও পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়ে এ পর্যন্ত ৮০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
এরই মধ্যে ২ ফেব্রুয়ারি থেকে এসএসসি পরীক্ষা নির্ধারিত থাকলেও ২০ দলীয় জোট হরতাল-অবরোধ প্রত্যাহার করেনি। পরীক্ষার মধ্যে হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি না দিতে সরকার, শিক্ষক ও অভিভাবকদের আহ্বানে সাড়া মেলেনি। এতে শিক্ষার্থীরা ছাড়াও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দিনমজুর, ব্যবসায়ীসহ সব মহলই। নাগরিক সমাজসহ কূটনৈতিক মহল সংলাপে বসার তাগিদ দিয়ে এলেও সাড়া মেলেনি।
এ অবস্থায় হরতাল-অবরোধে নাশকতা ও সহিংসতা বন্ধে এবং এসএসসি পরীক্ষা নির্বিঘ্ন করতে হাইকোর্টে রিট দুটি দায়ের করা হয়।
আইনজীবী আবদুল মতিন খসরু বলেন, বিগত ৫ জানুয়ারি থেকে ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যত ধরনের সহিংসতা, নাশকতার ঘটনা ঘটেছে রিটে আমরা তার সবই তুলে ধরেছি। এসব নাশকতা, সহিংসতার বিষয়ে যেসব খবর পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে সেগুলো রিট আবেদনের সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছি। আদালত শুনানি গ্রহণ শেষে অন্তর্বর্তী আদেশসহ রুল জারি করেছেন।
বিবৃতি দিয়ে হরতাল আহ্বানের ব্যাপারে আদালতের মন্তব্য তুলে ধরে অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু বলেন, আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেছেন, কোনো দল যদি হরতাল ডাকে তাহলে ওই দলের স্ট্যান্ডিং কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কিন্তু বর্তমানে হঠাৎ করেই কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই একটি বিবৃতি পাঠিয়ে হরতাল ডাকা হচ্ছে। যে লোকের কোনো কর্তৃত্বই নেই- সে এভাবে বিবৃতি দিয়ে একটি দলের নামে হরতাল আহ্বান করতে পারে না।
রুল পালনের আহ্বান সুরঞ্জিতের : হরতাল-অবরোধ বন্ধে হাইকোর্ট যে রুল জারি করেছেন তা সরকারসহ অন্য সব পক্ষকের পালন করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। রোববার জাতীয় সংসদ ভবনে কমিটির বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন। এ সময় কমিটির সদস্য শামসুল হক টুকু উপস্থিত ছিলেন।
সুরঞ্জিত বলেন, হাইকোর্টের ক্ষমতা আছে রুল জারি করার। তারা তা করেছেন। এ নিয়ে কথা বলার সময় হয়নি। এটা চূড়ান্ত হওয়ার পর আইন হবে। পশ্চিমা অনেক দেশেই এসব আন্দোলনে ক্ষয়ক্ষতির জন্য মামলা হয়েছে। সেসব দেশের মামলার রায়ও হয়েছে। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, হরতাল-অবরোধ করা যেমন রাজনৈতিক অধিকার, পাশাপাশি এও আছে নিজের অধিকার পালন করতে গিয়ে অন্যের অধিকার খর্ব করা যাবে না। হরতাল-অবরোধ যারা ডাক দেবে তাদের কর্মসূচিতে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হয় তাহলে সেই ক্ষতিপূরণ তাদেরই দিতে হবে। দেশে প্রথমবারের মতো পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) বিল-২০১৫ আইনে পরিণত করার উদ্যেগ নিয়েছে সরকার। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সুরঞ্জিত বলেন, ইতিমধ্যে পিপিপি বিল-২০১৫ সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। বিলটি যাচাই-বাছাই করার জন্য একটি সাব-কমিটি গঠন করা হয়েছে। এটি পাস করা হলে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব উন্নয়ন কাঠামো আরও গতি পাবে এবং নতুন মাত্রা যোগ হবে।

dsdsadsad